ভূমিকা: রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস প্রভৃতি কার্প জাতীয় মাছ বদ্ধ পানিতে পরিপক্বতা লাভ করে। কিন্তু সেখানে ডিম ছাড়ে না বা প্রজননে অংশগ্রহণ করে না। এ কারণে কৃত্রিম হরমোন ইনজেকশন P.G (Pituitary gland), H.C.G (Human Chorionic Gonadotrophin) মাংসপেশীতে প্রয়োগ করে বদ্ধ পানিতে তাদের প্রজননে উদ্বুদ্ধ করা হয়।
এ ক্ষেত্রে জলাশয়ের পরিপক্ক মাছ থেকে পিটুইটারী গ্রন্থি (P.G) এবং গর্ভবতী মহিলাদের মূত্র থেকে বিশেষ পদ্ধতিতে H.C.G সংগ্রহ করে তার নির্যাস ইনজেকশনের মাধ্যমে পরিপক্ক মাছের দেহে প্রবেশ করানো হয়। ফলে কার্পজাতীয় মাছের বদ্ধ পানিতে (পুকুরে) প্রজনন ঘটে। কৃত্রিম উপায়ে সম্পাদিত মাছের এরূপ প্রজননকে প্রণোদিত আবেশীয়/কৃত্রিম প্রজনন (Induced breeding) বলে।

বয়ঃপ্রাপ্ত স্ত্রী ও পুরুষ মাছ যাদের প্রজনন কাজে ব্যবহার করা হয় তাদের Brood fish বলে। উপযুক্ত Brood fish ছাড়া সফল Induced breeding সম্ভব নয়। সাধারণত মে, জুন ও জুলাই মাস কার্প জাতীয় মাছের প্রজনন কাল। তাই প্রজনন মৌসুমের ৩-৪ মাস পূর্বে পরিপক্বতা আনার জন্য মাছকে বিশেষ পরিচর্যার মাধ্যমে সুষম খাবার দিতে হয়।
সুষম খাবারে ৪০% চালের গুড়া, ৩০% খৈল ও ৩০% ফিসমিল থাকা দরকার। মাছের মজুদ ঘনত্ব স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকা ভাল। উপযুক্ত পরিচর্যার ফলে মার্চ মাসের মধ্যে কার্প জাতীয় মাছ প্রজনন পরিপক্বতা লাভ করে। বাংলাদেশে রুই, কাতলা, মৃগেল, কালিবাউস প্রভৃতি স্থানীয় এবং সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প, কার্পিও, মিরর কার্প, বিগহেড কার্প প্রভৃতি বিদেশী মেজর কার্পের প্রণোদিত প্রজনন করা হচ্ছে।
Brood fish এর সঠিক নির্বাচনের উপর প্রণোদিত প্রজননের সফলতা নির্ভর করে। মাছ বাছাই প্রকৃতপক্ষে অভিজ্ঞতার উপর নির্ভরশীল। তবে কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য পর্যবেক্ষণ করে স্ত্রী ও পুরুষ মাছের পরিপক্বতা নিরূপণ করা যায়। যথা:
| স্ত্রী কার্প মাছ | পুরুষ কার্প মাছ |
|---|---|
| (১) বক্ষ পাখনা মসৃণ থাকে। | (১) বক্ষ পাখনার উপরিভাগ খসখসে থাকে। |
| (২) পেট স্ফীত ও নরম। | (২) পেট স্বাভাবিক থাকে। |
| (৩) পায়ু ফোলা ও ঈষৎ গোলাপী থেকে লাল হয়। | (৩) পায়ু স্বাভাবিক থাকে। |
| (৪) পেটে সামান্য চাপ দিলে ডিম বা অন্য কিছু বের হবে না। | (৪) পেটে সামান্য চাপ দিলে শুক্র বের হয়। |
| (৫) জননেন্দ্রিয় বাইরের দিকে উদগত ও স্ফীত। | (৫) জননেন্দ্রিয় বর্ধিত নয়, দৃশ্যত কিঞ্চিৎ গভীর। |
মাছের হ্যাচারী ভিত্তিক প্রণোদিত প্রজননে যে সকল উপকরণ প্রয়োজন হয় সেগুলো হল-
১. সংরক্ষিত P.G বা H.C.G
২. হস্তচালিত বা ইলেকট্রিক সেন্টিফিউজার
৩. টেস্টটিউব
৪. ক্রাশিং মর্টার
৫. সূচসহ হাইডারমিক সিরিঞ্জ
৬. একখণ্ড নরম ফোম
৭. ছোট বড় বীকার।
৮. বিশুদ্ধ পানি (Distilled water)
৯. মিথাইল ব্লু
১০. প্লাস্টিকের বল
১১. একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ হ্যাচারী।
২-৩ বছর বয়সী যে কোন কার্প জাতীয় মাছের মস্তক অঞ্চল ব্যবচ্ছেদ করে পিটুইটারী গ্রন্থি সংগ্রহ করে ১০০% অ্যালকোহলে নিম্ন তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করা হয়। মাছের Breeding season-এর পূর্বেই এটি করা হয়ে থাকে।
প্রজননের সময় পূর্বে সংরক্ষিত P.G টিস্যু পেপার রেখে শুকিয়ে নিয়ে ক্রাশিং মর্টারে distilled water সহ চূর্ণ করা হয়। চূর্ণ করা P.G সেন্ট্রিফিউজার যন্ত্রে নিয়ে সেন্ট্রিফিউজ করলে উপরে পরিষ্কার দ্রবণ থাকে এবং নিচে তলানী জমা হয়। পরিষ্কার দবণ মি.লি. দাগ কাটা ইনজেকশন সিরিঞ্জে নিয়ে নির্দিষ্ট মাত্রায় মাছের শরীরে প্রবেশ করানো হয় (H.C.G গুড়া পানিতে গুলাতে হয়।

হরমোনের প্রয়োগ মাত্রা বিভিন্ন প্রজাতির মাছে বিভিন্ন রকম হয়ে থাকে। আবার P.G দ্রবণ ও H.C.G দ্রবণের প্রয়োগ মাত্রায়ও পার্থক্য আছে। তবে কার্প জাতীয় মাছের ক্ষেত্রে সাধারণত স্ত্রী মাছে ২ ডোজ এবং পুরুষ মাছে ১ ডোজ ইনজেকশন পুশ করা হয়। স্ত্রী মাছের ক্ষেত্রে প্রথম ডোজে কেজি প্রতি ২ মি.লি. এবং দ্বিতীয় ডোজে ৫-৬ মি.লি P.G দ্রবণ পুশ করা হয়। স্ত্রী মাছের প্রথম ডোজ দেয়ার ৬ ঘণ্টা পর স্ত্রী মাছে ২য় ডোজ ও পুরুষ মাছে প্রথম ডোজ দেয়া হয়। পুরুষ মাছে কেজি প্রতি ৫-৬ মি.লি P.G দ্রবণ দেয়া হয়। ইনজেকশন সাধারণত মাছের বক্ষ পাখনার গোড়ায় দেয়া হয়।
পিটুইটারী ইনজেকশন দেয়ার পর মাছ উত্তেজনা প্রাপ্ত হয়। তখন এদের মিলনের জন্য আলাদা নিরিবিলি স্থান প্রয়োজন হয়। তাই একটি স্ত্রী মাছ ও দু’টি পুরুষ মাছ Breeding হাপায় ছেড়ে দেয়া হয়। অতপর স্ত্রী মাছ ডিম ছাড়ে এবং পুরুষ মাছ সেই ডিম নিষিক্ত করে।
স্ত্রী মাছের দ্বিতীয় ডোজ এবং পুরুষ মাছের চূড়ান্ত ডোজ ইনজেকশন দেয়ার পর যে সকল মাছ চাপ প্রয়োগ ছাড়া প্রজননে সক্ষম তাদের ক্ষেত্রে স্ত্রী ও পুরুষ মাছ একত্রে এক ট্যাংকে ১ঃ১ অনুপাতে রাখা হয়। অন্যদিকে, যে সকল মাছের চাপ প্রয়োগ ছাড়া ডিম দেয়ার সম্ভাবনা নেই তাদের ক্ষেত্রে পুরুষ এবং স্ত্রী মাছকে আলাদা আলাদা ট্যাংকে রাখা হয়।
প্রজননের কমপক্ষে ৪/৫ ঘণ্টা পর নিষিক্ত ডিমগুলো জনন হাঁপা (Breeding hapa) থেকে Hatching হাঁপায় ছাড়া হয়।
উপরিউক্ত হাপার ভেতর ১ লক্ষ ডিম ছাড়া হয়। সাধারণত ২৭-২৮° সে. তাপামাত্রায় উক্ত ডিমগুলো ১৮-২২ ঘণ্টার মধ্যে পরিস্ফুটিত হয়। সদ্য নির্গত রেণুগুলো (Hatching) ভেতরের হাঁপার ছিদ্র পথে বের হয়ে বাইরের হাঁপায় চলে আসে। বাইরের হাপায় ৩ হতে ৪ দিন পর্যন্ত এদের কোন খাদ্য দেয়া হয় না। কারণ এদের দেহের ডিমের কুসুমই তখন খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ৩/৪ দিন পরে রেণুগুলোকে হাঁপা হতে সংগ্রহ করে একটি বিশেষ ছোট আঁতুড় পুকুরে ছাড়তে হয়। এরা যখন লম্বায় ৪/৫ ইঞ্চি হয় তখন পালন পুকুরে স্থানান্তর করা হয়।
Posted by : মোঃ নাহিদুল ইসলাম, রাজশাহী কলেজ
Source : ফলিত ও অর্থনৈতিক প্রাণিবিজ্ঞান (কবির পাবলিকেশন)
🔐 You must be Logged In to post a comment.
Login to Comment | Create Account