হোয়াটসঅ্যাপে আসছে কিশোর-কিশোরীদের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্ট — বাবা-মা পাবেন পুরো নিয়ন্ত্রণ!

ছোটবেলায় আমরা বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলতে চিঠি লিখতাম, পাড়ার মোড়ে দাঁড়িয়ে গল্প করতাম। সময় বদলেছে। এখনকার বাচ্চারা কথা বলে স্ক্রিনে আঙুল চালিয়ে। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার, টেলিগ্রাম — এসব এখন ওদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এত অল্প বয়সে এই ডিজিটাল দুনিয়ায় ওরা কতটা নিরাপদ?

whatsapp-thumbnail-nahidulbrobd

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই বড় একটা পদক্ষেপ নিল হোয়াটসঅ্যাপ। গত বুধবার, বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলস থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দিয়ে জানানো হলো — কিশোর-কিশোরীদের জন্য একেবারে নতুন ধরনের অ্যাকাউন্ট আনতে যাচ্ছে তারা।

ব্যাপারটা ঠিক কী?

সোজা কথায় বলতে গেলে, হোয়াটসঅ্যাপ এবার ১৩ বছরের কম বয়সি ছেলেমেয়েদের জন্য একটা আলাদা অ্যাকাউন্ট সিস্টেম তৈরি করেছে। এটা সাধারণ হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টের মতো না। এখানে বাবা-মা বা অভিভাবকরা সরাসরি সন্তানের অ্যাকাউন্টের ওপর নজরদারি রাখতে পারবেন। কে মেসেজ পাঠাচ্ছে, কোন গ্রুপে যুক্ত হচ্ছে, কার সঙ্গে কথা হচ্ছে — পুরো বিষয়টাই থাকবে অভিভাবকের হাতের মুঠোয়।

হোয়াটসঅ্যাপের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মেটা প্ল্যাটফর্মস এই ঘোষণা দিয়েছে। রয়টার্স সংবাদ সংস্থা প্রথম এই খবর প্রকাশ করে।

 

কেন এই উদ্যোগ?

গত কয়েক বছর ধরে সারা পৃথিবীতে একটা আলোচনা খুব জোরেশোরে চলছে — সোশ্যাল মিডিয়া কি আমাদের বাচ্চাদের ক্ষতি করছে? উত্তরটা দুঃখজনক হলেও সত্য, হ্যাঁ করছে। মনোবিদরা বারবার সতর্ক করে আসছেন যে অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম এবং সোশ্যাল মিডিয়ার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কিশোর বয়সিদের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। উদ্বেগ, বিষণ্নতা, ঘুমের সমস্যা, মনোযোগ হারানো — তালিকাটা বেশ লম্বা।

শুধু মানসিক স্বাস্থ্যই না, নিরাপত্তার বিষয়টাও আছে। অনলাইনে সাইবার বুলিং, অপরিচিতদের সঙ্গে যোগাযোগ, অনুচিত কনটেন্টের এক্সপোজার — এসব ঝুঁকি তো রয়েছেই। সাম্প্রতিক সময়ে হোয়াটসঅ্যাপে হ্যাকিং আর প্রতারণার ঘটনাও বেড়েছে অনেক। প্রতারকরা নানা কৌশলে ভেরিফিকেশন কোড বা পিন হাতিয়ে নিয়ে মানুষের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ঢুকে পড়ছে। বড়রাই যেখানে এসব ফাঁদে পা দিচ্ছেন, সেখানে বাচ্চাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

বিশ্বের বিভিন্ন সরকারও এই বিষয়ে নড়েচড়ে বসেছে। অস্ট্রেলিয়ার কথাই ধরুন। গত বছর দেশটি একটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে — নির্দিষ্ট বয়সের নিচে কিশোর-কিশোরীদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করেছে তারা। ইউরোপীয় ইউনিয়নও ডিজিটাল সেফটি নিয়ে কঠোর আইন আনছে ধাপে ধাপে। এই পুরো পরিস্থিতির চাপ এবং একই সঙ্গে দায়িত্ববোধ থেকেই মূলত হোয়াটসঅ্যাপ এই নতুন ফিচারের দিকে এগিয়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

 

অভিভাবকদের দাবি থেকেই জন্ম

মজার ব্যাপার হলো, এই আইডিয়াটা কিন্তু একেবারে ল্যাব থেকে আসেনি। হোয়াটসঅ্যাপ নিজেই জানিয়েছে, অনেক বাবা-মা দীর্ঘদিন ধরে একটা নিরাপদ মেসেজিং ব্যবস্থার কথা বলে আসছিলেন। তারা চাইছিলেন এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে তাদের সন্তানরা বন্ধুবান্ধব আর পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে পারবে, কিন্তু সেটা হবে একটা সুরক্ষিত গণ্ডির মধ্যে। বাইরের কেউ এসে সেই গণ্ডি ভাঙতে পারবে না সহজে।

অভিভাবকদের এই চাওয়াটাকে গুরুত্ব দিয়েই মেটা তাদের টিমকে কাজে লাগিয়েছে। ফলাফল — এই নতুন কিশোর-বান্ধব অ্যাকাউন্ট।

 

ঠিক কী কী সুবিধা থাকছে এই অ্যাকাউন্টে?

এবার আসি আসল প্রশ্নে। এই অ্যাকাউন্টে কী কী ফিচার থাকবে আর সেগুলো কীভাবে কাজ করবে?

  • এই অ্যাকাউন্টে শুধুমাত্র মেসেজ পাঠানো আর ভয়েস বা ভিডিও কল করার সুবিধা থাকবে। স্ট্যাটাস আপডেট, চ্যানেল ব্রাউজিং বা অন্যান্য সোশ্যাল ফিচার এখানে থাকছে না। মানে বাচ্চারা শুধু যোগাযোগের কাজটুকু করতে পারবে, বাকি সব এড়ানো যাবে।
  • ডিফল্ট প্রাইভেসি সেটিংস হবে অনেক কঠোর। সাধারণ অ্যাকাউন্টে আমরা যেটা ম্যানুয়ালি সেট করি, এখানে সেটা আগে থেকেই সবচেয়ে শক্তিশালী অবস্থানে সেট করা থাকবে।
  •  বাবা-মা নিজেরা ঠিক করে দিতে পারবেন কারা তাদের সন্তানকে মেসেজ করতে পারবে। ধরুন, আপনি চাইছেন আপনার সন্তান শুধু পরিবারের সদস্য আর স্কুলের কয়েকজন বন্ধুর সঙ্গে কথা বলুক — সেটা আপনি সেট করে দিতে পারবেন।
  • গ্রুপে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রেও অভিভাবকের অনুমতি লাগবে। মানে কেউ যদি আপনার সন্তানকে কোনো গ্রুপে অ্যাড করতে চায়, সেটা আগে আপনার কাছে আসবে অনুমোদনের জন্য।
  • অপরিচিত কারো কাছ থেকে মেসেজ রিকোয়েস্ট এলে সেটা সরাসরি বাচ্চার কাছে যাবে না। অভিভাবক আগে সেটা দেখবেন, যাচাই করবেন, তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন অনুমতি দেবেন কি না।
  • এককথায়, পুরো অ্যাকাউন্টটাই চলবে বাবা-মায়ের তত্ত্বাবধানে। বাচ্চারা নিরাপদে তাদের প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা বলতে পারবে, কিন্তু অনলাইন জগতের ঝুঁকিগুলো থেকে অনেকটাই দূরে থাকবে।

 

এটা কি সত্যিই কাজে দেবে?

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ফিচার কি আদৌ কাজে আসবে নাকি শুধু কাগজে-কলমে ভালো দেখাবে? সত্যি কথা বলতে, এটা অনেকটাই নির্ভর করবে বাবা-মায়েরা কতটা সক্রিয়ভাবে এটা ব্যবহার করেন তার ওপর। টেকনোলজি একটা হাতিয়ার দিতে পারে, কিন্তু সেই হাতিয়ার ব্যবহার করার দায়িত্বটা শেষ পর্যন্ত মানুষেরই।

তবে বিশেষজ্ঞরা এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। তাদের মতে, বড় টেক কোম্পানিগুলো যখন নিজে থেকে এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়, সেটা একটা ভালো সংকেত। এতে বোঝা যায় যে তারা শুধু মুনাফার কথা ভাবছে না, ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার বিষয়টাও তাদের মাথায় আছে।

শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোও মনে করছে, এটা সঠিক দিকে এগোনোর একটা ধাপ। তবে তারা এটাও বলছেন যে শুধু একটা ফিচার দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান হবে না। দরকার সার্বিক পদক্ষেপ — আইন, সচেতনতা, শিক্ষা এবং প্রযুক্তিগত সমাধান সব মিলিয়ে একটা সমন্বিত উদ্যোগ।

 

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে কতটা প্রাসঙ্গিক?

বাংলাদেশের কথা যদি বলি, এখানে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহারকারীর সংখ্যা বিশাল। আর গ্রামে-শহরে সব জায়গাতেই বাচ্চাদের হাতে স্মার্টফোন চলে আসছে অনেক কম বয়সেই। অনেক ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের পুরনো ফোন বাচ্চাদের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে অনলাইন ক্লাস বা পড়াশোনার অজুহাতে। কিন্তু সেই ফোনে কী হচ্ছে, কার সঙ্গে কথা হচ্ছে — সেটা অনেক অভিভাবকই খেয়াল রাখেন না বা রাখতে পারেন না।

এই অবস্থায় হোয়াটসঅ্যাপের এই নতুন অ্যাকাউন্ট ব্যবস্থা আমাদের দেশের বাবা-মায়েদের জন্যও বেশ কাজের হতে পারে। অন্তত একটা শুরু হবে। বাচ্চারা যে ডিজিটাল দুনিয়ায় পা রাখছে, সেখানে তাদের জন্য একটা সুরক্ষা বলয় তৈরি হবে।

 

উপসংহার

প্রযুক্তি থেমে থাকবে না, বাচ্চারাও থেমে থাকবে না। তাদেরকে ডিজিটাল জগৎ থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে রাখাটা বাস্তবসম্মত না, সম্ভবও না। কিন্তু তাদেরকে নিরাপদ রাখার দায়িত্বটা আমাদের সবার। হোয়াটসঅ্যাপের এই নতুন কিশোর অ্যাকাউন্ট হয়তো সেই দায়িত্ব পালনে একটা ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

এখন দেখার বিষয়, কবে নাগাদ এই ফিচার বাংলাদেশসহ সব দেশে চালু হয় এবং বাবা-মায়েরা আসলেই এটাকে কতটা গ্রহণ করেন। সেই সঙ্গে এটাও খেয়াল রাখতে হবে, প্রযুক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না করে বাচ্চাদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলার অভ্যাসটাও যেন আমরা ধরে রাখি।

🕐 2 months ago (March 24, 2026) 👁 49 Views · 💬 4
❤️ 1
1 Reactions · Login to react

🚩 Report This Post

About Author (7 Posts)

Admin
Nahidul Islam Sagor Srk Leo Messi & Shah Rukh Khan FAN Bangladesh , Owner Of Sagor.Bro.BD | I am a Zoologyst as well as a Web Developer!
📅 Mar 21, 2026 · ⭐ 85 Points

💬 4 Responses to "হোয়াটসঅ্যাপে আসছে কিশোর-কিশোরীদের জন্য আলাদা অ্যাকাউন্ট — বাবা-মা পাবেন পুরো নিয়ন্ত্রণ!"

  1. fakesijan Trainer

    😁😁

  2. SagorSrkian Admin

    Thanks for your valuable Comment Brother 🥰

  3. SagorSrkian Admin

    🥰

  4. SagorSrkian Admin

    test